বিজ্ঞাপন:
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ৫০ ঘরবাড়ি বিলীন, হুমকির মুখে শতাধিক পরিবার

ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ৫০ ঘরবাড়ি বিলীন, হুমকির মুখে শতাধিক পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার :: কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন গোয়ালপুরী চর। ভারতের আসাম সীমান্তঘেঁষা এই চরে একসময় প্রায় ৪০০ পরিবারের বসতি ছিল। কিন্তু অব্যাহত নদীভাঙনের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় দেড়শ পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। গত ১০ দিনেই নতুন করে ৫০টি পরিবারের বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে শতাধিক পরিবার।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরজুড়ে আতঙ্ক আর হাহাকার। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ বাঁশ-কাঠ সরিয়ে নিচ্ছেন। আবার কেউ শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে নদীর পাড়ে বসে নিরুপায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কোথাও কোথাও ভাঙনের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। মুহূর্তের মধ্যেই হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি আর অসংখ্য গাছপালা নদীর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের গোয়ালপুরী চর এলাকার মো. জসীমউদ্দীন (৪০) বলেন, বাব-দাদার ভিটা ছিল এখানে। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যে সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জায়গায় অস্থায়ীভাবে আছি। ছেলে মেয়েরা বলে, “এখন আমরা কোথায় থাকব”, তাদের কোনো উত্তর দিতে পারি না।

একই এলাকার নূর হোসেন (৫০) বলেন, ঘর ভাঙার সময় স্ত্রী আর সন্তানদের কান্না দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল। এখন খাবারের চিন্তা, থাকার চিন্তা—সব মিলিয়ে বড় কষ্টে আছি।

পাষাণ মিয়া বলেন, আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। এখন যদি সরকার সাহায্য না করে, তাহলে পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে।

আজগার আলী (৬০) বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর ছিল এই চরে। সেই কবরস্থানও নদীতে চলে গেছে। নিজের মানুষদের কবর হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

লালচাঁদ মিয়া (৫০) বলেন, নদী শুধু ঘরবাড়ি নেয়নি, আমার স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা যেন নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে গেছি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভাঙনের তীব্রতায় গ্রামের কবরস্থান ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শেষ মুহূর্তে এলাকার একটি মসজিদ ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় ভাঙছে। আতঙ্কে অনেকে আগেভাগেই ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, একসময় এই চরে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদীভাঙনের কারণে দেড়শ পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। গত ১০ দিনে ৫০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে তাতে আরও প্রায় শতাধিক পরিবার যে কোনো সময় ভিটেমাটি হারাতে পারে।

চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ, কুড়িগ্রাম জেলার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, গোয়ালপুরী চরের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এ ভাঙন অব্যাহত থাকলে পুরো চরটিই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে নদীভাঙনের শিকার মানুষ ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা সরকার থেকে খোঁজখবর নেয়া হয় না।

তিনি আরেও বলেন নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ, খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীভাঙনকবলিত মানুষের জন্য একটি স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানাই।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ৩৬টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পয়েন্টে ভাঙনরোধে কাজ চলছে। বাকি স্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com